গল্পসমগ্র

“জীবন কখনো কখনো গল্পের মতো আবার গল্প কখনো কখনো জীবনের মতো।”

মহাজন

এক

গ্রামের নাম ধলপুর।

পদ্মার শাখানদী কুমারী এই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যুগ যুগ ধরে। কুমারীর জল এখন আর আগের মতো নেই — শুকনো মৌসুমে কোথাও কোথাও বুক দেখা যায়, চর জেগে ওঠে। গ্রামের মানুষগুলোও যেন সেই নদীর মতোই — একসময় টইটুম্বুর ছিল, এখন ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে আসছে।

রহিম মিয়ার বাড়ি গ্রামের পশ্চিম পাড়ায়। তিনটে ঘর, একটা উঠোন। উঠোনের কোণে একটা পেয়ারা গাছ — সেই গাছে এখনও পাখি বসে, কিন্তু রহিম মিয়ার মনে পাখির ডাক আর পৌঁছায় না।

রহিম মিয়ার বয়স পঁয়তাল্লিশ। মাথায় চুল পাকতে শুরু করেছে, গালে কয়েকদিনের না-কামানো দাড়ি। চোখের নিচে কালি — রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। দিনমজুরি করেন, মাঠে কাজ করেন, অন্যের জমিতে ফসল ফলান। নিজের জমি বলতে তিন কাঠা ভিটে, যেটুকুর উপর দাঁড়িয়ে আছে তার সংসার।

স্ত্রীর নাম রাহেলা। বয়স চল্লিশ। একসময় রূপ ছিল — গ্রামের মানুষ বলত, রহিম মিয়া ভাগ্যবান। কিন্তু সংসারের ঘানি টানতে টানতে রাহেলার সেই রূপ এখন ম্লান। তবু চোখদুটো এখনও উজ্জ্বল — সেই চোখে স্বপ্ন আছে, সংসারের প্রতি ভালোবাসা আছে।

দুই ছেলে। বড়টার নাম সুজন, বয়স বারো। ছোটটার নাম রাজু, বয়স আট। সুজন স্কুলে যায়, রাজু এখনও পুরোপুরি যাওয়া শুরু করেনি।

এই সংসারে সুখ কম ছিল না একসময়। কম হলেও যা ছিল, তাতে মানুষ হওয়া যেত। কিন্তু গত বছর থেকে অভাব যেন পাকাপাকিভাবে ঘর বেঁধেছে রহিম মিয়ার উঠোনে।
প্রথমে হলো বন্যা। কুমারী নদী উপচে পড়ল। মাঠের ধান ডুবে গেল। সারা বছরের পরিশ্রম জলের নিচে। তারপর রাহেলার শরীর খারাপ — জ্বর ছাড়ছে না, ডাক্তার দেখাতে হলো, ওষুধ কিনতে হলো। কিছু টাকা যা জমা ছিল তা দিয়েই চলে গেল। তারপর ছোট ছেলে রাজুর হঠাৎ অসুখ — পেটের সমস্যা, হাসপাতালে নিতে হলো শহরে।

একটার পর একটা বিপদ।

রহিম মিয়া রাতে শুয়ে থাকেন আর ভাবেন — এভাবে আর কতদিন? চাল নেই ঘরে, তেল নেই, নুন নেই। সুজনের বেতন দেওয়া হয়নি দুই মাস — মাস্টার বলেছেন আর দেরি করলে নাম কেটে দেবেন। শীতকাল আসছে, বাচ্চাদের জন্য একটা কম্বলও নেই।

রাহেলা স্বামীকে দেখেন। কিছু বলেন না। শুধু রাতে মাঝে মাঝে শাড়ির আঁচলে চোখ মোছেন।

দুই

গ্রামের পূর্ব দিকে হরিপদ সাহার বাড়ি।

হরিপদ সাহা — মানুষ বলে মহাজন। বয়স পঞ্চাশের ওপরে। গায়ের রং ফর্সা, ভুঁড়ি আছে, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। সবসময় পরিষ্কার পোশাক পরেন। বাড়িটা পাকা, বড়ো, গেটের সামনে গাছপালা। দোতলায় উঠলে গ্রামটা পুরো দেখা যায়।

হরিপদ সাহার বাপ মহাজনি করতেন, দাদাও করতেন। বংশপরম্পরায় এই ব্যবসা। গ্রামের অর্ধেক মানুষ কোনো না কোনো সময় তার কাছে হাত পেতেছে। সুদের হার বেশি — মাসে দশ টাকায় তিন টাকা। কেউ যদি সময়মতো না দেয়, সুদের উপর সুদ বাড়তে থাকে।

কিন্তু হরিপদ সাহা শুধু টাকার মানুষ নন। তার আরেকটা পরিচয় আছে — যেটা মুখে কেউ বলে না, কিন্তু সবাই জানে। গ্রামের কোনো অসহায় পরিবার যখন টাকা দিতে পারে না, হরিপদ সাহা তাদের সঙ্গে একটা ভিন্ন ব্যবস্থার কথা বলেন। সেই ব্যবস্থার কথা আড়ালে আড়ালে মানুষ জানে, কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ বলে না।

কারণ ভয়।

হরিপদ সাহার হাতে টাকা আছে, জমি আছে, প্রভাব আছে। থানার দারোগার সঙ্গে সম্পর্ক আছে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান তার বন্ধু। এই গ্রামে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারো নেই।

তিন

একদিন ভোরবেলা রহিম মিয়া বাড়ি থেকে বের হলেন।
রাহেলা বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছ এত সকালে?’

রহিম মিয়া থামলেন। স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘একটু কাজে।’

রাহেলা আর জিজ্ঞেস করলেন না। কিন্তু বুকের ভেতরে কী যেন একটা চিনচিন করে উঠল।

রহিম মিয়া হাঁটতে হাঁটতে গেলেন পূর্ব পাড়ায়। হরিপদ সাহার বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়ালেন কিছুক্ষণ। পায়ের তলায় মাটি যেন সরে যাচ্ছিল। লজ্জা ছিল, দ্বিধা ছিল, কিন্তু উপায় ছিল না।

দারোয়ান ডাকল, ‘কী চাই?’

‘মহাজনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

‘নাম কী?’

‘রহিম মিয়া। পশ্চিম পাড়ার।’

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ভেতরে ডাক এলো।

হরিপদ সাহা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। রহিম মিয়াকে দেখে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। বললেন, ‘বোসো।’

রহিম মিয়া বসলেন। হাতের আঙুলগুলো অস্থির হয়ে নিজেদের মধ্যে পেঁচিয়ে গেল।

‘কী দরকার?’

রহিম মিয়া গলা খাঁকারি দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন পুরো কথা। বন্যার কথা, স্ত্রীর অসুখের কথা, ছেলের চিকিৎসার কথা। বললেন পাঁচ হাজার টাকা দরকার। বললেন ধান উঠলে পরিশোধ করে দেবেন।

হরিপদ সাহা চা-এর কাপ নামালেন। মুখে কোনো ভাব নেই। বললেন, ‘সুদের হার জানো তো?’

‘জানি।’

‘মাসে মাসে দিতে পারবে?’

রহিম মিয়া মাথা নাড়লেন। ‘চেষ্টা করব।’

হরিপদ সাহা কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে। কাল সকালে এসো। টাকা পাবে।’

রহিম মিয়া উঠে দাঁড়ালেন। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো — স্বস্তির, নাকি আশঙ্কার, সেটা তিনি নিজেও বুঝলেন না।

চার

পাঁচ হাজার টাকা ঘরে এলো।

রাহেলা টাকাগুলো দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় পেলে?’

‘হরিপদবাবুর কাছ থেকে।’

রাহেলার মুখ ম্লান হয়ে গেল। ‘মহাজনের কাছে গিয়েছিলে? কত সুদে?’

‘চিন্তা করো না। সামলে নেব।’

রাহেলা আর কিছু বললেন না। কিন্তু মনের ভেতরে একটা ভয় বাসা বাঁধল।

টাকায় চাল এলো, তেল এলো। সুজনের বেতন দেওয়া হলো। রাজুর ওষুধ কেনা হলো। ঘরে একটু হাসির আলো ফিরল।

কিন্তু সেই আলো বেশিদিন টিকল না।

ধান উঠল ঠিকই, কিন্তু দাম পড়ে গেছে বাজারে। মহাজনের সুদ দিয়ে মূল টাকায় হাত পড়ল না। বরং মাস যেতে না যেতেই সুদ জমতে লাগল। পাঁচ হাজার হয়ে গেল ছয় হাজার, তারপর সাড়ে সাত হাজার।

রহিম মিয়া বুঝলেন — এই ফাঁদ থেকে বেরোনো সহজ নয়।
দিনমজুরি করেন আরো বেশি। মাঠে কাজ করেন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু শরীর আর সায় দেয় না। পিঠে ব্যথা হয়, হাঁটু ধরে আসে। তবু থামেন না।

রাহেলা রাতে স্বামীর পিঠে হাত বোলান। কিছু বলেন না, শুধু হাত বোলান।

এই স্পর্শই রহিম মিয়ার শক্তি।

পাঁচ

এক বছর পেরিয়ে গেল।

পাঁচ হাজার টাকা এখন দশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। হরিপদ সাহার লোক মাঝে মাঝে আসে। ভদ্রভাবে কথা বলে, কিন্তু চোখের ভেতরে হুমকি থাকে।

‘মহাজনবাবু বলেছেন, আর দেরি করলে ভালো হবে না।’

রহিম মিয়া মাথা নিচু করে থাকেন। বলেন, ‘আরেকটু সময় দাও।’

একদিন হরিপদ সাহা নিজেই এলেন।

সন্ধ্যাবেলা। রহিম মিয়া মাঠ থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে বসেছিলেন। রাহেলা রান্না করছিলেন। ছেলেরা উঠোনে খেলছিল।

হরিপদ সাহা গেটের সামনে দাঁড়ালেন। ‘রহিম মিয়া আছ?’

রহিম মিয়া চমকে উঠলেন। বাইরে এলেন। ‘আসুন, আসুন।’

হরিপদ সাহা ঢুকলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন। বললেন, ‘টাকার কী হলো?’

রহিম মিয়া আমতা আমতা করলেন। ‘একটু সময় লাগবে। ধান বিক্রি করে—’

‘ধান দিয়ে কুলোবে না। সুদ-আসলে এখন বারো হাজার।’
রহিম মিয়া চুপ করে রইলেন।

হরিপদ সাহা তখন নিচু গলায় বললেন, ‘দেখো, একটা উপায় আছে।’

রহিম মিয়া তাকালেন।

হরিপদ সাহার চোখে একটা অদ্ভুত আলো। বললেন, ‘তোমার বউ — রাহেলা — দেখেছি, ভালো মানুষ। তুমি যদি—’

রহিম মিয়া বুঝতে পারলেন না প্রথমে। তারপর বুঝলেন।

মুখের রক্ত নেমে গেল।

‘কী বললেন আপনি?’

হরিপদ সাহা চশমা ঠিক করলেন। মুখে নিরীহ ভাব রেখে বললেন, ‘বলছি যদি রাহেলা মাঝে মাঝে আমার বাড়িতে কাজকর্ম করতে আসে — বুঝলে? তাহলে টাকার ব্যাপারটা একটু সহজ হয়ে যায়।’

রহিম মিয়ার বুকের ভেতরে কে যেন ছুরি ঢুকিয়ে দিল।
‘বেরিয়ে যান।’ গলা কাঁপছে।

‘রহিম মিয়া, রাগ করো না। ভেবে দেখো। বারো হাজার টাকা — এই টাকা তুমি কোনোদিন দিতে পারবে না। আমি সহজ একটা উপায় বলছি।’

‘বেরিয়ে যান আমার বাড়ি থেকে।’

হরিপদ সাহার মুখে হাসি ফুটল। নিষ্ঠুর হাসি। বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু ভেবো। আমার কাছে কাগজপত্র আছে। আদালতে গেলে তোমার ভিটাটুকুও যাবে।”
বলে চলে গেলেন।

ছয়

রহিম মিয়া উঠোনে দাঁড়িয়ে রইলেন অনেকক্ষণ।
ছেলেদের খেলার শব্দ কানে আসছে। রান্নাঘর থেকে রাহেলার ডাক আসছে, ‘খেতে আসো।’

কিন্তু রহিম মিয়ার পা সরছে না।

মাথার ভেতর শুধু হরিপদ সাহার কথাগুলো ঘুরছে। অপমান, ক্রোধ, অসহায়ত্ব — সব মিলিয়ে একটা ঝড় বইছে বুকের ভেতর।

রাহেলা বাইরে এলেন। স্বামীকে দেখলেন — দাঁড়িয়ে আছেন, মূর্তির মতো। বললেন, ‘কী হয়েছে? হরিপদবাবু কী বলল?’

রহিম মিয়া ঘুরে তাকালেন। রাহেলার চোখে চোখ পড়ল।
সেই চোখ। সেই পরিচিত চোখ। বিশ বছরের সংসার। দুটো ছেলে। কত সুখ-দুঃখ পার করেছেন একসাথে।

রহিম মিয়া বললেন না কিছু। শুধু বললেন, ‘কিছু না।’

রাহেলা বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু জোর করলেন না।

সেই রাতে রহিম মিয়া ঘুমালেন না। শুয়ে রইলেন চোখ খুলে। রাহেলার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনলেন। সেই শব্দে একটা শান্তি আছে, একটা বিশ্বাস আছে।

কখনো পারব না। কোনোদিন পারব না।
এই কথাটা মনে মনে বললেন রহিম মিয়া। তারপর চোখ বন্ধ করলেন।

সাত

পরদিন রাহেলা সব জানলেন।

রহিম মিয়া বলেননি। কিন্তু পাশের বাড়ির করিম মিয়ার বউ বলল। হরিপদ সাহার লোক গ্রামে রটিয়ে দিয়েছে — হুমকি হিসেবে।

রাহেলা রান্নাঘরে ছিলেন। শুনে হাতের বাটিটা নামিয়ে রাখলেন। মুখ শক্ত হয়ে গেল।

রহিম মিয়া ঘরে ফিরলে রাহেলা বললেন, ‘সব জেনেছি।’

রহিম মিয়া মাথা নিচু করলেন।

‘কবে থেকে জানো?’

‘কাল থেকে।’

রাহেলা কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, ‘আমাকে বলোনি কেন?’

রহিম মিয়া কী জবাব দেবেন বুঝলেন না।

রাহেলার চোখে জল এলো। কিন্তু ভেঙে পড়লেন না। বললেন, ‘শোনো, যতদিন আমি আছি — ওই বাড়ির দিকে আমি যাব না। এই সংসারের ইজ্জত বিকিয়ে টাকা শোধ হবে না।’

‘কিন্তু বারো হাজার টাকা—’

‘টাকা দেব। কিন্তু এই পথে না।’

রহিম মিয়া স্ত্রীর দিকে তাকালেন। চোখ ভিজে এলো।
রাহেলা বললেন, ‘মাথা উঁচু রাখো। উপায় বের করব আমরা।’

আট

রাহেলা নিজেই পথ খুঁজলেন।

পাশের শহরে একটা গার্মেন্টস কারখানা আছে। শুনেছিলেন মেয়েরা কাজ করে সেখানে। রাহেলা ঠিক করলেন যাবেন।
রহিম মিয়া রাজি হলেন না প্রথমে। ‘তুমি কাজে যাবে? কী বলবে লোকে?’

‘লোকে যা বলার বলুক। ইজ্জত বাঁচিয়ে কাজ করার চেয়ে বড়ো কথা কী আছে?’

রহিম মিয়া চুপ করে রইলেন।

রাহেলা বললেন, ‘তুমি মাঠে কাজ করো, আমি কারখানায় করব। দুজনে মিলে শোধ করব।’

সুজন মাকে বলল, ‘মা, আমিও কাজ করব।’

রাহেলা ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন। ‘না, বাবা। তুই পড়বি। পড়াশোনাই তোর কাজ।’

পরদিন রাহেলা শহরে গেলেন। কারখানায় গিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললেন। কাজ পেলেন।
সপ্তাহে ছয়দিন। সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা।

নয়

হরিপদ সাহার লোক আবার এলো একদিন।
রহিম মিয়া তখন বাড়িতে নেই। রাজু একা ঘরে পড়ছিল।
রাহেলা দরজায় এলেন।

‘মহাজনবাবু ডেকেছেন।’

রাহেলা সরাসরি বললেন, ‘বলো, সময়মতো টাকা দেব। কিন্তু মহাজনবাবুর বাড়িতে যাওয়ার কথা মাথায় নেই আমার।’

লোকটা হাসল। ‘বউ খুব সাহসী হয়েছ দেখছি।’

‘সাহস না, ইজ্জত।’ রাহেলা দরজা বন্ধ করে দিলেন।
সেই রাতে রাহেলা অনেকক্ষণ বসে রইলেন একা। ভয় ছিল, কিন্তু পিছু হটার ইচ্ছা ছিল না।

দশ

গ্রামে এবার একটা ঘটনা ঘটল।

হরিপদ সাহার পাশের গ্রামে একটা মামলা হয়েছে। অন্য এক মহাজনের বিরুদ্ধে। গ্রামের এনজিও কাজ করছে মানুষদের নিয়ে।

সেই এনজিওর একজন মহিলা কর্মী — নাম সালমা বেগম — ধলপুরেও আসেন মাঝে মাঝে। রাহেলার সঙ্গে পরিচয় হয় তার।

রাহেলা সব বললেন সালমা বেগমকে। হরিপদ সাহার কথা, টাকার কথা, অবৈধ প্রস্তাবের কথা।

সালমা বেগম মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বললেন, ‘এই কথা লিখিত দিতে পারবেন?’

রাহেলা একটু ভাবলেন। ‘কী হবে?’

‘থানায় অভিযোগ হবে। এটা আইনের অপরাধ।’

‘থানা তো হরিপদ সাহার সঙ্গে আছে।’

‘উপজেলায় মহিলা বিষয়ক অফিস আছে। জেলায় আদালত আছে। আমরা আছি।’

রাহেলা ভাবলেন। রাতে রহিম মিয়াকে বললেন।
রহিম মিয়া ভয় পেলেন। ‘ঝামেলা বাড়বে।’

‘ঝামেলা তো এমনিই আছে। এভাবে চললে শেষ হবে কোনোদিন? আজ আমাকে বলেছে, কাল আরেকজনকে বলবে। এভাবে কতজন ভয়ে চুপ থাকবে?’

রহিম মিয়া স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন। এই মেয়েটা বিশ বছর ধরে পাশে আছে। কোনোদিন ভুল পথে নিয়ে যায়নি।
‘ঠিক আছে।’ বললেন রহিম মিয়া।

এগারো

অভিযোগ দেওয়া হলো।

প্রথমে কিছু হলো না। থানার দারোগা এড়িয়ে গেল। কিন্তু সালমা বেগমের এনজিও সক্রিয়। উপজেলায় গেল, জেলা প্রশাসনে গেল।

স্থানীয় একটা পত্রিকা খবর ছাপল — ‘ধলপুরে মহাজনের অনৈতিক প্রস্তাব, ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ।
গ্রামে হইচই পড়ে গেল।

হরিপদ সাহা প্রথমে হুমকি দিলেন। তারপর দেখলেন পরিস্থিতি অন্যরকম। গ্রামের অনেক মানুষ এগিয়ে আসছে। যারা আগে ভয়ে চুপ থাকত, তারাও মুখ খুলছে।

পাঁচ গ্রামের মানুষ জানল হরিপদ সাহার আসল চরিত্র।

বারো

জেলা আদালতে মামলা উঠল।

রাহেলাকে সাক্ষ্য দিতে হলো। সেদিন রহিম মিয়া পাশে ছিলেন। সুজন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

রাহেলা কাঁপছিলেন। কিন্তু কণ্ঠস্বর স্থির ছিল।

বিচারক প্রশ্ন করলেন, ‘হরিপদ সাহা ঠিক কী বলেছিল?’
রাহেলা স্পষ্ট করে বললেন সব।

আদালতে নীরবতা।

হরিপদ সাহার উকিল চেষ্টা করল ঘুরিয়ে দিতে। বলল, ‘এটা তোমাদের বানানো গল্প।’

রাহেলা বললেন, ‘না। এটা আমার জীবনের সত্যি।’

তেরো

রায় এলো তিন মাস পর।

হরিপদ সাহাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। নারী নির্যাতন আইনে মামলা, জরিমানা, এবং সুদের টাকা মওকুফের নির্দেশ।

গ্রামের মানুষ যখন রায়ের কথা শুনল, অনেকেই বলাবলি করল — ‘এতদিনে হলো।’

হরিপদ সাহার বাড়ির গেট সেদিন বন্ধ ছিল।

রহিম মিয়া বাড়ি ফিরলেন সন্ধ্যায়। রাহেলা উঠোনে বসে ছিলেন। সুজন আর রাজু মায়ের পাশে।

রহিম মিয়া এলেন। কিছু বললেন না। শুধু রাহেলার পাশে বসলেন।

রাহেলা একবার স্বামীর দিকে তাকালেন। তারপর আকাশের দিকে তাকালেন।

পেয়ারা গাছে পাখি বসেছিল। ডাকছিল। এই ডাক আজ রহিম মিয়ার কানে পৌঁছাল।

সময় আবার সচল হলো ধলপুরে। রহিম মিয়া মাঠে কাজ করেন। রাহেলা কারখানায় যান। সুজন পড়ে। রাজু ইস্কুলে ভর্তি হয়েছে।

অভাব এখনও আছে। পুরোপুরি যায়নি। কিন্তু অভাবের ভেতরে একটা মাথা উঁচু করে বাঁচার আনন্দ আছে — সেটা আগে ছিল না।

রাহেলা মাঝে মাঝে রাতে বলেন, ‘ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু মনে হলো, চুপ থাকলে আরো অনেকের সঙ্গে এটা হবে।’

রহিম মিয়া বলেন, ‘তুমি না থাকলে আমি পারতাম না।’

রাহেলা হাসেন। সেই হাসিতে ক্লান্তি আছে, কিন্তু গর্বও আছে।

কুমারী নদী এখনও বয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে শুকায়, বর্ষায় ভরে ওঠে। কিন্তু থামে না। বয়েই চলে।

মানুষও তেমনই।

বিপদ আসে, অন্যায় আসে, অসহায়ত্ব আসে — কিন্তু যে মানুষ ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে চায়, সে কোনো না কোনো পথ খুঁজে পায়।

ধলপুরের রাহেলা সেই পথ খুঁজে পেয়েছিলেন।